ঢাকাশনিবার , ২৬ নভেম্বর ২০২২

মেহেরপুরে কুমড়া বড়ি তৈরির ধুম

মাজিদ আল মামুন
নভেম্বর ২৬, ২০২২ ৮:১০ অপরাহ্ণ
Link Copied!
   
                       

মাজিদ আল মামুন-  নিজস্ব প্রতিনিধিঃ
মাস কলাইয়ের ডাল কয়েক ঘন্টা ভিজিয়ে রেখে মিলে ভাঙ্গানোর পর তার সাথে পাকা চাল কুমড়া, মুলা কিংবা অন্যান্য সবজি ভাল করে ফেনিয়ে মিশিয়ে তৈরী করা হয় শীত কালের উপাদেয় খাবার কুমড়া বড়ি। গত ১ সপ্তাহ পূর্বে কিছুটা শীতের আমেজ শুরু হয়েছে যদিও হাড়কাঁপানো শীত এখনো শুরু হয়নি। তবুও মেহেরপুরের অনেকেই কুমড়া বড়ি তৈরি ও বাজারজাত করণের কাজ শুরু করেছেন। মুখরোচক হওয়ায় মেহেরপুরের ভোজন বিলাসীরা শোল, টাকি, ফাতাসি, টেংরা মাছ, ডিমসহ বিভিন্ন মাছ কুমড়া বড়ি দিয়ে রান্না করে খেতে পছন্দ করেন। যদিও দেশের অন্যান্য জেলার লোকজন বড়ি কি তা চেনেনা। তবে দেশ থেকে প্রবাসীরা বিদেশে যাওয়ার সময় কুমড়ার বড়ি এখন অনেকের কাছেই পরিচিত।
ইন্দোনেশিয়া ও মালেশিয়ার অনেক মহিলাদের কাছেও কুমড়ার বড়ি পরিচিতি লাভ করেছে। মেহেরপুর সদর, গাংনী ও মুজিবনগর উপজেলায় বিভিন্ন এলাকার প্রায় প্রতিটা পরিবার কুমড়ার বড়ি তৈরি করে থাকেন। কেউ কেউ তা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। কুমড়ার বড়ি সবচেয়ে বেশি তৈরি হয় গাংনী উপজেলায়। এ উপজেলার প্রতিটা পরিবারের একেকজন একেকটা কুমড়া বড়ি তৈরির কারিগর। জেলার প্রায় প্রতিটা গ্রামেই রয়েছে কুমড়া থেকে বড়ি তৈরির উপযোগী কুমড়া ও ডাল ভাঙানো মেশিন। অনেক রাইচ মিলেও এ মেশিন রয়েছে। ভোর থেকে শুরু করে সকাল ৯/১০ টা অবধি এসব মেশিন দ্বারা কুমড়া ও ডাল কুটানো/ভাঙানো হয়ে থাকে। গাংনী উপজেলার মাইলমারী গ্রামের কয়েকজন মিল মালিক জানান, বছরের প্রায় ২/৩ মাস আমরা কুমড়া বড়ি তৈরির জন্য কুমড়া কুটে থাকি। হাড়কাঁপানো শীততে আমাদের আরাম নেই।
গ্রামের অধিকাংশ মহিলাই মাস কলাইয়ের পাশাপাশি খেশারী, ছোলা ও এ্যাংকর ডাল ভিজিয়ে ধুয়ে পরিষ্কার করে মিলে ভাঙ্গিয়ে থাকে। এর পর খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে এগুলি পাকা কুমড়া কিংবা মুলা দিয়ে ভাল করে ফেনিয়ে পলিথিনের প্যাকেটে ভরে পলিথিনের নিচের দিকের কোনা পরিমান মতো কেটে সে অংশ দিয়ে টিনের তৈলাক্ত মাচায় কিংবা মইয়ের উপর বাঁশের চাটাই দিয়ে তার উপর বড়ি দেয়। কুমড়া বড়ি তৈরিতে এ এলাকার মহিলারা পাকা উস্তাদ। তারা কুমড়া বড়ি রোদে শুকিয়ে শক্ত হয়ে গেলে উঠিয়ে রাখে। উঠিয়ে রাখার জন্য ২/৩ দিন রোদে রাখে যাতে করে সকল বড়ি সমান ভাবে রোদ পায়। ভাল রোদ হলে দুই দিনেই শুকিয়ে যায় কুমড়া বড়ি। শুকোনোর পর বাড়ির পুরুষ সদস্যরা সেগুলি পার্শ্ববর্তী বাজারসহ স্থানীয় হাট বাজারে বিক্রি করেন। এমনকি কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গা জেলাতেও বিক্রি করে থাকে।
মুজিবনগর উপজেলার কয়েকজন কুমড়া বড়ি তৈরির মহিলা জানান, গত বছরের চেয়ে এবার সব ধরণের ডালের দাম বেড়েছে। তাছাড়া মাস কলাই সোনার হরিণ হওয়ায় এখনো অনেকেই মাস কলাইয়ের ডালের বড়ি তৈরি শুরু করেনি। উপকরণের দাম বাড়ায় ক্রেতাকে বেশি দামে কুমড়া বড়ি কিনতে হবে।
তিনারা আরো জানান, সংসারে অনেক খরচ। তাই বসে না থেকে কুমড়ো বড়ি তৈরি করি। ছেলেরা হাট বাজারে এগুলি বিক্রি করে। এতে বাড়তি কিছু আয় আসে। এ বাড়তি আয়টুকু সংসার পরিচালনায় সহায়ক ভূমিকা রাখে। এক নাগাড়ে বৃষ্টি হলে কিংবা খুব ঘুণ কুয়াসা হলে বড়ি পঁচে যায়। তখন আমাদের অনেক ক্ষতি হয়ে যায়। সোনাপুর গ্রামের হীরা জানান, স্থানীয় ক্রেতাদের পাশাপাশি ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষ কুমড়া বড়ি কিনে নিয়ে যান। এমনকি প্রবাসীরাও দেশে আসলে আবার বিদেশে যাওয়ার সময় কিনে নিয়ে যান কুমড়ার বড়ি।
পশ্চিম মালশাদহ গ্রামের আয়েশা আক্তার জানান, এলাকার প্রতিটা বাড়িতেই কুমড়া বড়ি তৈরি করা হয়ে থাকে যা আগামী ১ বছরে বিভিন্ন মাছের সাথে রান্না করে খাওয়া হয়।
গাংনী-কাথুলী মোড়ের মমতাজ খাতুন জানান, ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি মায়েরা কুমড়ার বড়ি দিচ্ছে। খেতে অসম্ভব সুস্বাদু হওয়ায় সে ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছি। কুমড়ার বড়ি তেলে ভেজে গুড়া করে মরিচ, লবন, সরিষার তেল, পেয়াজ দিয়ে ভাতের সাথে অসাধারণ লাগে।
লক্ষ্ণীনারায়ণপুর গ্রামের আনোয়ারা খাতুন জানান, ৭/৮ টা কুমড়া রেখেছি। মাস কলাই ঘরে উঠলেই শুরু করবো বড়ি দেওয়ার কাজ।
মাইলমারী গ্রামের ফারহানা জানান, প্রায় ২০ টি কুমড়া ছিল। পাড়ার মহিলা ও আত্মীয়-স্বজনের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে তা বিলি করতে করতে আর ৫ টি রয়েছে। কাজীপুর-হাড়াভাঙ্গা এলাকার মাস কলাই বিক্রি করতে আসলেই তা ক্রয় করে বড়ি দেবো। উল্লেখ্য, মেহেরপুরের কুমড়া বড়ি এখন দেশের গন্ডি পেরিয়ে যাচ্ছে সিংগাপুর, মালেশিয়া, কুয়েত, মরিচা, ব্রুনাই, ইতালি, সৌদি আরব, দুবাই, কাতার, ইরাকসহ বিভিন্ন দেশে।