ঢাকারবিবার , ৩১ মার্চ ২০২৪

৩০ মার্চ বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার প্রয়াণ দিবস

উজ্জ্বল কুমার সরকার
মার্চ ৩১, ২০২৪ ১২:৩৮ অপরাহ্ণ
Link Copied!
   
                       

উজ্জ্বল কুমার সরকারঃ

বাংলাদেশের অন্যতম বুদ্ধিজীবী, বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের শহীদ জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা একজন বাংলাদেশী বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষাবিদ। তার অন্যতম পরিচয় তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হওয়া বুদ্ধিজীবীদের একজন। জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা ১৯২০ সালের ১০ জুলাই ময়মনসিংহ শহরের বড়বাসায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল বরিশালের বানারীপাড়ায়। তাঁর পিতা কুমুদচন্দ্র গুহঠাকুরতা ছিলেন একজন স্কুলশিক্ষক। জ্যোতির্ময় ছিলেন একজন মেধাবী ছাত্র। তিনি ১৯৩৬ সালে ময়মনসিংহ জেলা স্কুল থেকে প্রবেশিকা পাস করে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে আইএসসি শ্রেণিতে একবছর অধ্যয়ন করেন।
কিন্তু টাইফয়েড রোগে আক্রান্ত হওয়ার কারণে তিনি পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করতে পারেননি। পরে তিনি ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে ভর্তি হন এবং ১৯৩৯ সালে কৃতিত্বের সাথে আইএ পাস করেন। তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও তিনি কৃতিত্বের সঙ্গে ইংরেজিতে অনার্সসহ বিএ (১৯৪২) এবং এম.এ (১৯৪৩) ডিগ্রি লাভ করেন। অধ্যয়ন শেষ হতেই জ্যোতির্ময় কিশোরগঞ্জ গুরুদয়াল কলেজে অধ্যাপনার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন। সেখান থেকে ওই বছরই তিনি ঢাকার জগন্নাথ কলেজে চলে আসেন।
জগন্নাথ কলেজে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত চাকরি করার পর জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে প্রভাষক পদে যোগদান করেন। ষাটের দশকে তিনি উচ্চতর গবেষণার জন্য ফেলোশিপ নিয়ে লন্ডন যান। এরপর ১৯৬৭ সালে ‘Classical Myths in Plays of Swinburne, Bridges, Sturge Moore and Eliot’ শীর্ষক অভিসন্দর্ভ রচনা করে কিংস কলেজ থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।
পরের বছর নিজ কর্মস্থল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করে তিনি রিডার পদে উন্নীত হন এবং আমৃত্যু এ বিভাগেই কর্মরত ছিলেন।
অধ্যাপনার পাশাপাশি তিনি জগন্নাথ হলের আবাসিক শিক্ষক ছিলেন তিনি। এছাড়া তিনি জগন্নাথ হলের প্রভোস্টের দায়িত্বও পালন করেন।
জ্যোতির্ময় ছিলেন যুক্তিবাদী ও প্রগতিশীল চিন্তার অধিকারী। তিনি ব্যক্তিগত ধ্যান-ধারণায় মানবেন্দ্রনাথ রায়ের বা এমএনরায়ের র‌্যাডিক্যাল হিউম্যানিজমে বিশ্বাস করতেন। তাঁর প্রচুর রচনাবলিতে এর প্রতিফলন ঘটেছে।
তিনি ইন্টারন্যাশনাল র‌্যাডিক্যাল হিউম্যানিস্ট অ্যাসোসিয়েশন, ঢাকা সেন্টার অব দি ইন্টারন্যাশনাল কুয়াকারস সার্ভিসেস এর সাথে জড়িত ছিলেন। সাহিত্য সংস্কৃতি মনোভাবাপন্ন জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা বুলবুল একাডেমি অব ফাইন আর্টস-এরও সদস্য ছিলেন। ১৯৫১ সালে তিনি দেরাদুনে অনুষ্ঠিত অল-ইন্ডিয়া হিউম্যানিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের বার্ষিক সভায় যোগ দেন। এবং ১৯৬৪ সালে হেগ-এ অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল হিউম্যানিস্ট অ্যান্ড ইথিক্যাল ইউনিয়নের সম্মেলনে যোগ দেন জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা । তিনি সাহিত্য, রাজনীতি ও সমাজ সম্পর্কে ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষায় অনেক জ্ঞানগর্ভ মূল্যবান প্রবন্ধ রচনা করেন। জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার মৃত্যুর পর ১৯৮২ সালে তাঁর পিএইচডি অভিসন্দর্ভটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। যা আজও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অমূল্য সম্পদ। জ্যোতির্ময় ছিলেন সমাজের কল্যাণমূলক বিচিত্র বিষয়ে উৎসাহী একজন সংস্কৃতিবান মানুষ। দেশের যেকোনো প্রগতিশীল আন্দোলন এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে তাঁর ঘনিষ্ঠ সংশ্লিষ্টতা ছিল। এ কারণে তিনি সর্বমহলে পরিচিত ছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ গভীর রাতে ঢাকার বিশ্ববিদ্যালয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বর্বরোচিত গণহত্যা শুরু করলে তখন তিনি ছিলেন জগন্নাথ হলের দায়িত্বে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাকেও গুলিবিদ্ধ করে। রক্তাক্ত অবস্থায় একসময় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে, জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা মৃত্যুর সাথে লড়াই করে ৩০ শে মার্চ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।